বঙ্গীয় বিপ্লবী সংগ্রামী বাঙালি নারীদের ভূমিকা (1905-1935) : একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

Author(s): Manusi Biswas

Abstract:

ভূমিকা-ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তা এক অনন্য অগ্নিঝরা অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ (1905) এর পর থেকে বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ পর্যায়ের উত্থান ঘটায়। 1905 সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে 1935 সালের ভারত শাসন আইন প্রবর্তন পর্যন্ত এই তিন দশকে বাংলার রাজনৈতিক আকাশে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, সেখানে বাঙালি নারীদের অংশগ্রহণ ছিল এক যুগান্তরকারী ও সমাজতান্ত্রিক বিস্ময়। এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো, প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসের বয়ানকে ছাপিয়ে কীভাবে বাঙালি নারীরা অন্তরমহলের গন্ডি পেরিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের অগ্রভাগে উঠে এসেছিলেন তার একটি সামগ্রিক ও বিশ্লেষণাত্মক রূপরেখা তৈরি করা। বাংলার এই বিশেষ ঐতিহাসিক কালখন্ডে নারীদের ভূমিকা কেবল সহায়ক বা আলঙ্কারিক ছিল না, বরং তারা ছিলেন রণকৌশল নির্ধারণকারী,অস্ত্র সরবরাহকারী,সম্মুখ সমরের নির্ভীক যোদ্ধা। বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের 1905 সালের লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের দিকে তাকাতে হবে। এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটি বাংলার জনমানসে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, তা কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা এক সর্বাত্মক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার রূপ ধারণ করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক দমন- পীড়ন জনসাধারণের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, তা সশস্ত্র প্রতিরোধের পথকে প্রশস্ত করে। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় বাঙালি নারীরা তাদের সনাতনী ঘরোয়ার ভূমিকা ত্যাগ করে এক আমূল পরিবর্তনকারী রূপে আবির্ভূত হন । এই আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি ছিল, অত্যন্ত গভীর এবং তা মূলত হিন্দু ধর্মের ' শক্তি ' উপাসনা এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ' আনন্দমঠ ' উপন্যাসের ' বন্দেমাতরম ' মন্ত্র নারীদের মধ্যে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা সঞ্চার করেছিল। দেবী দুর্গা বা কালীর আদলে দেবীদেরকে শক্তির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করে দেশমাতৃকাকে ' ভারতমাতা ' হিসেবে পূজা করার প্রথা এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে ডাক দেওয়াহয়েছিল তা বাঙালি নারীদের হৃদয়ের মধ্যে এক বিশেষ অনুরন সৃষ্টি করে । নারীরা নিজেদেরকে এই শক্তির অংশ হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেন। তাঁদেরকে চিরাচরিত গৃহবধূ বা মায়ের ভাবমূর্তি থেকে বের করে এনে এক সাহসী যোদ্ধার মূর্তিতে অধিষ্ঠিত করেন , যা কেবল ঔপনিবেশিক শক্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেনি , বরং ভারতীয় সমাজের সুগভীর পিতৃতন্ত্রকেওষ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। এই গবেষণা পত্রটি 1905-1935 সাল পর্যন্ত সময়কালে বাঙালি নারীদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, তাদের সাংগাঠনিক দক্ষতা, তাত্ত্বিক অবদান এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংগ্রাম এবং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের অংশ হিসেবে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ উপস্থাপনের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।

PDF URL: View Article in PDF